কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার

কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (১৮৩৪-১৯০৭) দুইটি নীতিবিষয়ক কাব্য লিখে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তার 'সদ্ভাবশতক'(১৮৬১) ও 'মোহভোগ'(১৮৭১) একসময় ছাত্রদের নীতিশিক্ষা দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হত। তাঁর কিছু কিছু কবিতা এখনও নীতিশিক্ষার কাজে ব্যবহার করা হয়।
তাঁর দুটি জনপ্রিয় কবিতা হল:-
ক.
যে জন দিবসে
মনের হরষে
জ্বালায় মোমের বাতি,
আশুগৃহে তার
দেখিবে না আর
নিশীথে প্রদীপ ভাতি।
খ.
চির সুখীজন
ভ্রমে কি কখন
ব্যথিত বেদন
বুঝিতে পারে?
কি যাতনা বিষে
বুঝিবে সে কিসে
কভু আশীবিশে
দংশেনি যারে।

কাজী নজরুল ইসলাম


কাজী নজরুল ইসলামের ১০৯ তম জন্মজয়ন্তী হয়ে গেল। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর স্মরণে বাংলা উইকিপিডিয়া থেকে কাজী নজরুল ইসলাম ভুক্তি থেকে কিছু অংশ প্রকাশ করছি।

কাজী নজরুল ইসলাম (মে ২৫, ১৮৯৯ আগস্ট ২৯, ১৯৭৬), বাঙালি কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, দার্শনিক, যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকার জন্য সর্বাধিক পরিচিতবাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতী কবিপশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ - দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃততাঁর কবিতা বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবি বলা হতার কবিতার মূল বিষবস্তু ছিল মানুষের প্রতি মানুষের অত্যাচার এবং দাসত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদবাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীমএকাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যা ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চারতাঁর কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছেঅগ্নিবীণা হাতে তাঁর প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশযেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে - কাজেই "বিদ্রোহী কবি"

নজরুল এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেনতার প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মীস্থানী এক মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজও করেছিলেনবিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে যেয়ে তিনি কবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করেনভারতী সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেনএসম তিনি কলকাতাতেই থাকতেনএসম তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হনপ্রকাশ করেন বিদ্রোহী এবং ভাঙার গানের মত কবিতা; ধূমকেতুর মত সাময়িকীজেলে বন্দী হলে পর লিখেন রাজবন্দীর জবানবন্দীএই সব সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্টধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতী জনগণের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিলতার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহধর্মী লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেনছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিতবাংলা কাব্য তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেনএটি হল ইসলামী সঙ্গীত তথা গজলনজরুল প্রা ৩০০০ গান রচনা এবং সুর করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা "নজরুল গীতি" নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিমধ্যবসে তিনি পিক্‌স ডিজিজে আক্রান্ত হনএর ফলে দীর্ঘদিন তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হএকই সাথে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেনবাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৭২ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকা আসেনএসম তাকে বাংলাদেশের জাতীতা প্রদান করা হয়এখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন

সূত্র: বাংলা উইকিপিডিয়া

বিদ্যাপতি

একছত্রও বাংলা পংক্তি রচনা করেননি, তবুও তাঁকে বাংলা বৈষ্ণব পদসাহিত্য থেকে বাদ দেবার উপায় নেই। তিনি হলেন 'বিদ্যাপতি'। তিনি বাঙালী নন, বাংলা ভাষাতেও তাঁর কোন রচনা নেই, লিখেছেন মাতৃভাষা মৈথিলিতেই। কিন্তু মধ্যযুগে তিনি বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয় কবি ছিলেন। তাকে মধ্যযুগের 'কবি সার্বভৌম' বলা হয়। কেউ কেই তাঁকে বলেন 'Cosmic Imagination' । বস্তুত তার মতো উচ্চমার্গীয় গীতিকবিতা মধ্যযুগের পূর্বে আর কেউ রচনা করতে পারেন নি।
মিথিলার একাধিক রাজার সান্নিধ্য তিনি পেয়েছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা মিথিলার রাজসভায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল। কেউ ছিলেন রাজসভাপণ্ডিত, কেউ ছিলেন সেনাপতি। কিন্তু বিদ্যাপতি মৈথিলি রাজসভার কোন পদাধিকারী ছিলেন না। ধারণা করা হয় 'বিদ্যাপতি' কোন ব্যক্তিবিশেষের নামও নয়। এই শব্দটি এক বিশেষ ধরণের গীতি রচয়িতা কবিদের সাধারণ নাম। এদের মধ্যে মৈথিল ছিল, বাঙালি ছিল, আবার নেপালীও ছিল। এঁদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তিনিই আমাদের আলোচ্য কবি। ইনি চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে এক প্রখ্যাত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নিয়ে ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন বলে মনে করা হয়। তিনি ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত। তাঁর পাণ্ডিত্য তাঁকে রাজাদের সান্নিধ্যে নিয়ে গিয়েছিল। তার কয়েকটি বিখ্রাত গ্রন্থ হল ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে রচিত 'ভুপরিক্রমা', ১৪১০ খ্রিস্টাব্দে রচিত 'পুরুষ পরীক্ষা' ও 'কীর্তিপতাকা', ১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে রচিত 'লিখনাবলী', ১৪৩০-৪০ খ্রিস্টাব্দে রচিত 'শৈবসর্বস্বহার' ও 'গঙ্গাবাক্যাবলী', ১৪৪০-৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত 'বিভাগসাগর', 'দানবাক্যাবলী' ও 'দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী'। ড. অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায় বলেছেন -
"পান্ডিত্যে তিনি সারা মিথিলায় শ্রদ্ধান্বিত স্থান লাভ করেছিলেন, তাঁর কোন কোন সংস্কৃত গ্রন্থ একদা বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়েছিল। স্মৃতি-সংহিতা ও নানাশাস্ত্রে সুপন্ডিত বিখ্যাত ব্রাহ্মণ-কবি বিদ্যাপতি ঠাকুর মিথিলার সংস্কৃতিতে চরম শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত আছেন। মিথিলায় বার বার মুসলমান আক্রমণ ও অধিকারের ফলে এ অঞ্চলের হিন্দু সংস্কৃতি বিশেষভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিল। দেশ আবার মিথিলা রাজাদের অধিকারে এলে মিথিলার বিপর্যস্ত হিন্দু সমাজ ও সংস্কৃতির পুনর্গঠনের ভার তাঁরা বিদ্যাপতির ওপর ন্যস্ত করে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। বিদ্যাপতিও সংস্কৃতে পৌরাণিক ও স্মৃতি গ্রন্থাদি রচনা ও প্রচার করে মিথিলার শিথির হিন্দু সমাজকে নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে আনবার চেষ্টা করেছিলেন। এই জন্য মিথিলার সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর দান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকৃত হয়।"
বিদ্যাপতির প্রধান কৃতিত্ব তাঁর রাধাকৃষ্ণ পদাবলীগুলিতে। এই বিষয়ক তাঁর রচিত পদসংখ্যা পাঁচশ'র ও বেশি। সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্র অনুযায়ী তিনি তাঁর রচনায় নায়ক নায়িকার পূর্বরাগ, প্রথম মিলন, অভিসার, কলহ, মান, অভিমান, বিরহ, পুনর্মিলন প্রভৃতি বর্ণনা করেছেন।
তাঁর একটি বিখ্যাত পদ হল:-
সখি, হমরি দুখক নাহি ওর।
এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।।
ঝম্পি ঘন গর- জন্তি সন্ততি
ভুবন ভরি বরিখন্তিয়া।।
কান্ত পাহুন কাম দারুণ
সঘনে খরশর হন্তিয়া।।
কুলিশ কত শত পাত মোদিত
মৌর নাচত মাতিয়া।
মত্ত দাদুরি ডাকে ডাহুকী
ফাটি যাওত ছতিয়া।।

অন্নদামঙ্গল

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর এর অন্নদামঙ্গল কাব্যের এই অংশটি আমার প্রিয়। ব্যাজস্তুতি অলংকারের উদাহরণ হিসেবে এই অংশটি অবশ্য উল্লেখযোগ্য বলে পরিগণিত হয়।
অন্নপূর্ণা উত্তরিলা গাঙ্গিনীর তীরে।
পার কর বলিয়া ডাকিলা পাটুনীরে।।
সেই ঘাটে খেয়া দেয় ঈশ্বরী পাটুনী।
ত্বরায় আনিল নৌকা বামাস্বর শুনি।।
ঈশ্বরীরে জিজ্ঞাসিল ঈশ্বরী পাটুনী।
একা দেখি কুলবধু কে বট আপনি।।
পরিচয় না দিলে করিতে নারি পার।
ভয় করি কি জানি কে দিবে ফেরফার।।
ঈশ্বরীরে পরিচয় কহেন ঈশ্বরী।
বুঝহ ঈশ্বরী আমি পরিচয় করি।।
বিশেষণে সবিশেষ কহিবারে পারি।
জানহ স্বামীর নাম নাহি ধরে নারী।।
গোত্রের প্রধান পিতা মুখবংশজাত।
পরমকুলীন স্বামী বন্দবংশখ্যাত।।
পিতামহ দিলা মোরে অন্নপূর্ণা নাম।
অনেকের পতি তেঁই পতি মোর বাম।।
অতিবড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধতে নিপুণ।
কোন গুণ নাহি তাঁর কপালে আগুন।।
কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠভরা বিষ।
কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।।
গঙ্গা নামে সতা তার তরঙ্গ এমনি।
জীবনস্বরূপা সে স্বামীর শিরোমণি।।
ভূত নাচাইয়া পতি ফেরে ঘরে ঘরে।
না মরে পাষাণ বাপ দিলা হেন বরে।।
অভিমানে সমুদ্রেতে ঝাঁপ দিলা ভাই।
যে মোরে আপনা ভাবে তারি ঘরে যাই।।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গতকাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী গেল। মনে পড়ছে হুমায়ুন আজাদের একটি প্রবচন "বাংলার আকাশের নাম রবীন্দ্রাকাশ

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কিছু তথ্য বাংলা উইকিপিডিয়া থেকে তুলে ধরছি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ই মে, ১৮৬১ - ৭ই আগস্ট, ১৯৪১) (২৫শে বৈশাখ, ১২৬৮ - ২২শে শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) বাংলা সাহিত্যের দিকপাল কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার ও দার্শনিক। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন। তিনি তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে তিনি প্রথম এশীয় হিসাবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি তার সারা জীবনের কর্মে সমৃদ্ধ হয়েছে। বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে তিনি বিশ্বকবি, কবিগুরু ও গুরুদেব নামে পরিচিত। তিনি বিশ্বের একমাত্র কবি যিনি দুটি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত আমার সোনার বাংলা এবং ভারতের জাতীয় সঙ্গীত জন গণ মন উভয়টির রচয়িতাই রবীন্দ্রনাথ। বলা যায় তাঁর হাতে বাঙ্গালীর ভাষা ও সাহিত্য,শিল্পকলা ও শিল্প চেতনা নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত

বাংলা উপন্যাসের জনক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছাত্র জীবন থেকেই কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি লিখতেনতাঁর রচনাগুলো প্রকাশিত হত ঈশ্বর গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকায়ঈশ্বর গুপ্তকে তিনি গুরু বলে স্বীকার করতেনঋণ শোধ করার চেষ্টা করেছেন গুরুর প্রাসঙ্গিক কবিতাসংগ্রহের সম্পাদনা করার মাধ্যমে

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর এর মৃত্যুর (১৭৬০) পর বাংলা সাহিত্যে শতাব্দীকালব্যাপী কোন নতুন কাব্যপ্রকরণের উদ্ভব হয়নিড. অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায় এর মতে "কবিওয়ালাদের উচ্চকিত উল্লাস বাংলা সাহিত্যের হাঁটুজলে ঘোলাটে বুদবুদ সৃষ্টি করেছিল।" এই হাঁটুজলের ডোবাতে ঈশ্বর গুপ্ত যে ক্ষীণ স্রোতধারার সঞ্চার করেছিলেন তা জলোচ্ছাসে পরিণত হয় মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতেপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্পর্শ ঈশ্বর গুপ্ত তেমন পাননিফলে তাঁর স্বভাবপ্রকৃতি আধুনিক শিক্ষার দ্বারা মার্জিত হননিতিনি প্রধানত 'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকা প্রকাশ করতেননিজেই ছিলেন সম্পাদকএই পত্রিকার কারণে তিনি যে যুগের সংস্কৃতিমান বাঙালির মনে এক বিশেষ স্থান লাভ করেছিলেনশুধু অভিজাত ব্যক্তিবর্গ নয়, ইংরেজ শাসকরাও তার পত্রিকার নিবিষ্ট পাঠক ছিলেনবাস্তবজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর পুঁথিগত বিদ্যার দুর্বলতাকে অনেকাংশেই ঢেকে দিয়েছেনিয়মিত প্রকাশনার প্রয়োজনে তাকে নিয়মিত তাৎক্ষণিকভাবে লিখতে হতযথাযথ শিক্ষার অভাব ও কালিক প্রয়োজন তার সৃষ্টিসম্ভারের শিল্পসৌকর্য অনেক সময় হালকা করে দিয়েছেস্বভাবসুলভ পরিহাসপ্রিয়তাকে তাই তিনি ক্ষেত্র বিশেষে পরিমিত রাখতে পারেননিতাই তাঁর অধিকাংশ রচনা, হাস্যকৌতুক, ভাঁড়ামোর বাহন হয়ে পরেছে

তাঁর সৃষ্টিভাণ্ডারে ঈশ্বরপ্রেম, নীতিবাচক, প্রকৃতিলগ্নতা, নারীপ্রেম, দেশপ্রেম, সমকালীন সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি, ব্যঙ্গ বিদ্রুপ বিভিন্ন বিচিত্র প্রকৃতির রচনা রয়েছেঅসিতকুমার বন্দোপাধ্যায় এর মতে- "বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গীর ওপর ভিত্তি করে কলকাতার জীবনে বসে তিনি প্রকৃতির যে মূর্তি উপলব্ধি করেছেন, তার রঙ্গপরিহাস অতিশয় উপভোগ্য হয়েছেকিন্তু তিনি প্রেম-প্রণয় ঘটিত যে কবিতাগুলি লিখেছেন, সেগুলি গতানুগতিক, কৃত্রিম এবং স্থানে স্থানে হাস্যকর হয়ে পড়েছে।" কলকাতার কাছাকাছি 'কাঁচড়[পাড়া' নামক স্থানে তাঁর জন্ম হয়শৈশবে মাতৃহীন হনযৌবনে স্ত্রীর সাহচর্য তেমন পাননিফলে সংহত আবেগ তার জীবনে কোন সুক্ষ্ম সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেনিবাস্তব জীবনের জটিলতা তাকে আবেগচর্চার কোন সুযোগ দেয়নিতাই প্রেম তাঁর কাছে হাস্যকার যন্ত্রণার চাইতে বেশি কিছু ছিল না

তবে তাঁর স্বদেশপ্রেম বিষয়ক কবিতাগুলো নিজগুণেই বিশেষ মর্যাদার দাবি রাখেসেযুগে পাশ্চাত্য আদর্শের বলে বলীয়ান হয়ে স্বদেশী 'ইয়ং বেঙ্গল'রা তাদের বিভিন্ন আলোচনা ও রচনায় দেশপ্রেমর প্রচারকার্য চালাতেনকিন্তু ইংরেজি ভাষায় হওয়ায় তা সাধারণ মানুষের মর্মে প্রবেশ করত নাঈশ্বর গুপ্ত সর্বপ্রথম দেশপ্রেমের উজ্জীবনী মন্ত্র বাংলাভাষায় প্রচার শুরু করেনজন্মভূমির মমতায় আবেগে আকুল হয়ে তার মতো করে এর আগে আর কেউ কাব্য রচনা করেনি

জননী ভারতভূমি আর কেন থাক তুমি

ধর্মরূপ ভূষাহীন হয়ে

তোমার কুমার যত সকলেই জ্ঞানহত

মিছে কেন মর ভার বয়ে?

তার আরেকটি কবিতায় তার দেশপ্রেমিক মনের বিশেষ পরিচয় পাওয়া যাজন্মভূমিকে বাংলা কবিতায় এভাবে বন্দনা করার উদাহরন বিরল

মিছা মণি মুক্তা হেম স্বদেশের প্রিয় প্রেম

তার চেয়ে রত্ন নাই আর

সুধাকরে কত সুধা দূর করে তৃষ্ণাক্ষুধা

স্বদেশের শুভ সমাচার

ভ্রাতৃভাব ভাবি মনে দেখ দেশবাসিগণে

প্রেমপূর্ণ নয়ন মেলিয়া

কত রূপ স্নেহ করি দেশের কুকুর ধরি

বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া

সমাজজীবনকে ব্যঙ্গ করে রচিত কৌতুককর কবিতাগুলি ঈশ্বর গুপ্তকে বাংলা সাহিত্যে বাঁচিয়ে রাখবে বহুকালবিভিন্ন অসঙ্গতিকে বিদ্রপের হুল ফোটাতে তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেনতাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলো হল -'ধন্য রে বোতলবাসী ধন্য লাল জল,' 'আগে মেয়েগুলো ছিল ভাল ব্রতকর্ম কর্তো সবে,' 'সোনার বাঙাল করে কাঙাল ইয়ং বাঙাল যত জনা,' 'এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গ ভরা,' 'কসাই অনেক ভালো গোসাইয়ের চেয়ে,' এমন পাঠার নাম যে রেখে বোকা, নিজে সেই বোকা নয় ঝাড়ে বংশে বোজা,' 'এই কালোর ভিতর আলো আছে, ভালো করে দেখ জ্বেলে,' ইত্যাদি।

তিনি সমসাময়ি বিভিন্ন ঘটনাকে আম্রয় করে যে ধরণের ব্যঙ্গ কবিতা লিখেচেন তাকে ফরাসি ভাষায় বলে 'vers de societe' অর্থাৎ 'সমাজকে নিয়ে লেখা হালকা চালের কবিতা'।

অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায় এর মতে -"ভাবাবেগে আর্দ্র বাংলা সাহিত্যে তিনি বুদ্ধির চমক একেছেন এর জন্য তিনি বাংলা কাব্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ড্রাইডেন সম্বন্ধে বলা হয়, "Libritium invenity, marmoream peliquit' অর্থাৎ 'ইটের টুকরোকে তিনি মার্বেল পাথরে পরিণত করেছিলেন'। কোন কোন দিক থেকে ঈশ্বরগুপ্তের প্রসঙ্গে উক্ত লাতিন প্রবচনটি প্রযুক্তহতে পারে।"

ঈশ্বরগুপ্তের মৃত্যুর পর তাঁকে অনেকে ভুলে যাচ্ছিল। বিপরীত মনোভঙ্গির কবি হয়েও মাইকেল মধুসূদন দত্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন-

"আছিলে রাখালরাজ কাব্য-ব্রজধামে

জীবে তুমি; নানা খেলা খেলিলে হরষে;

যমুনা হয়েছে পার, তেঁই গোপগ্রামে

সবে কি ভুলিল তোমা?"

ঈশ্বর গুপ্ত সম্পর্কে তাঁর শিষ্য বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে মন্তব্য করেছেন তার চাইতে বেশি কিছু বলার আর অবকাশ নেই।

তিনি বলেছেন-"মনুষ্যহৃদয়ের কোমল, গম্ভীর, উন্নত, অস্ফুট ভাবগুলি ধরিয়া তাহাকে গঠন দিয়া, অব্যক্তকে তিনি ব্যক্ত করিতে জানিতেন না; সৌন্দর্যসৃষ্টিতে তিনি তাদৃশ পটু ছিলেন না।... যাহা আছে ঈশ্বর গুপ্ত তাহার কবি। তিনি এই বাঙ্গালা সমাজের কবি। তিনি বাঙ্গালার গ্রাম্যদেশের কবি।...ঈশ্বর গুপ্ত Realist এবং ঈশ্বর গুপ্ত Satirist।"

বাংলার সীমানা

নীহারঞ্জন রায় এর বাঙ্গালীর ইতিহাস গ্রন্থে বঙ্গভূমির সীমানার একটি সুন্দর বর্ণনা আছে। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩ ৫৬ সালে।
উত্তরে হিমালয় এবং হিমালয়ধৃত নেপাল, সিকিম ও ভোটান রাজ্য; উত্তর-পূর্বদিকে ব্রহ্মপুত্র নদ ও উপত্যকা; উত্তর-পশ্চিম দিকে দ্বারবঙ্গ পর্যন্ত ভাগীরথীর উত্তর সমান্তরালবর্তী সমভূমি; পূর্বদিকে গারো-খাসিয়া-জৈন্তিয়া-ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম শৈলশ্রেণী বাহিয়া দক্ষিণ সমুদ্র পর্যন্ত; পশ্চিমে রাজমহল-সাঁওতাল পরগনা-ছোটনাগপুর-মানভূম-ধলভূম-কেওঞ্জর-ময়ূরভঞ্জের শৈলময় অরণ্যময় মালভূমি; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই প্রাকৃতিক সীমাবিধৃত ভূমিখণ্ডের মধ্যেই প্রাচীন বাঙলার গৌড়-পুন্ড্র-বরেন্দ্রী-রাঢ়-সুহ্ম-তাম্রলিপ্তি-সমতট-বঙ্গ-বঙ্গাল-হরিকেল প্রভৃতি জনপদ; ভাগীরথী-করতোয়া-ব্রহ্মপুত্র-পদ্মা-মেঘনা এবং আরও অসংখ্য নদনদীবিধৌত বাঙলার গ্রাম, প্রান্তর, পাহাড়, কান্তার। এই ভূখণ্ডই ঐতিহাসিক কালের বাঙালীর কর্মকৃতির উৎস এবং ধর্ম-কর্ম-নর্মভূমি। একদিকে সু-উচ্চ পর্বত, দুইদিকে কঠিন শৈলভূমি, আর একদিকে বিস্তীর্ণ সমুদ্র; মাঝখানে সমভূমির সাম্য- ইহাই বাঙালীর ভৌগলিক ভাগ্য। আজ হিমালয় আমাদের নামমাত্রই; সমুদ্রও বুঝি নামমাত্র; তাম্রলিপ্তি সত্যই সকরুণ স্মৃতি। সাম্প্রতিক বাঙলার উত্তরে তরাই বনভূমি, দক্ষিণে সুন্দরবন ও তৃণাস্তীর্ণ জলাভূমি। এই দুইয়ে মিলিয়া যেন বাঙলাদেশকে উষ্ণ জলীয়তার ক্লান্ত অবসাদে ঘিরিয়া ধরিয়াছে। বিংশ শতাব্দীর এক বাঙালী কবির লেখনীতে এই ভৌগলিক ভাগ্য সুন্দর কাব্যময় রূপ গ্রহণ করিয়াছে। কবিতাটি সমগ্র উদ্ধৃতির দাবি রাখে:

হিমালয় নাম মাত্র,
আমাদের সমুদ্র কোথায়?
টিমটিম করে শুধু খেলো দুটি বন্দরের বাতি।
সমুদ্রের দু:সাহসী জাহাজ ভেড়ে না সেথা;
-তাম্রলিপ্তি সকরুণ স্মৃতি।

দিগন্ত-বিস্তৃত স্বপ্ন আছে বটে সমতল সবুজ খেতের,
কত উগ্র নদী সেই স্বনেতে গেল মজে হেজে;
একা পদ্মা মরে মাথা কুটে।

উত্তরে উত্তুঙ্গ গিরি
দক্ষিণেতে দুরন্ত সাগর
যে দারুণ দেবতার বর,
মাঠভরা ধান দিয়ে শুধু
গান দিয়ে নিরাপদ খেয়া-তরণীর
পরিতৃপ্ত জীবনের ধন্যবাদ দিয়ে
তারে কভু তুষ্ট করা যায়!
ছবির মতন গ্রাম
স্বপনের মতন শহর
যতো পারো গড়ো,
অর্চনার চূড়া তুলে ধরো
তারাদের পানে;
তবু জেনো আরো এক মৃত্যুদীপ্ত মানে
ছিলো এই ভূখণ্ডের,
-ছিলো সেই সাগরের পাহাড়ের দেবতার মনে।
সেই অর্থে লাঞ্ছিত যে, তাই,
আমাদের সীমা হল
দক্ষিণে সুন্দরবন
উত্তরে টেরাই!
['ভৌগলিক']- প্রেমেন্দ্র মিত্র

বই আলোচনা সমালোচনা

সাহিত্যের Webzine