কাজী নজরুলের গানে ঈশ্বর

কাজী নজরুলের গানে ঈশ্বর বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছেন। কখনও রুদ্র মূর্তি কখনও বা শিশুমূর্তি। তাঁর একটি বিখ্যাত গান রয়েছে যেখানে ঈশ্বর শিশুরূপ গ্রহণ করে পৃথিবীকে নিয়ে নিরন্তর খেলা করে চলছেন।
খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে
প্রলয়-সৃষ্টি তব পুতুল খেলা নিরজনে,
প্রভু, নিরজনে।
শূন্যে মহা-আকাশে
মগ্ন লীলা-বিলাসে
ভাঙিছ গড়িছ নিতি ক্ষণে ক্ষণে-
তারকা-রবি-শশী খেলনা তব
হে উদাসী
পড়িয়া আছে তব পায়ের কাছে
রাশি রাশি।

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা

গতকাল শামসুর রাহমানের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হল। স্বাধীনতার জন্য তাঁর যে আকুলতা তা স্পষ্ট হয়েছে আর একটি কবিতায়। এই কবিতার নাম তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?

তুমি আসবে ব'লে, হে স্বাধীনতা,
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,
সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর।
তুমি আসবে ব'লে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মত চিত্কার করতে করতে
তুমি আসবে ব'লে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হলো। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।
তুমি আসবে ব'লে, ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।
তুমি আসবে ব'লে, বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভূর বাস্তুভিটার
ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করলো একটা কুকুর।
তুমি আসবে ব'লে, হে স্বাধীনতা,
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিলো পিতামাতার লাশের উপর।

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে এক থুত্থুরে বুড়ো
উদাস দাওয়ায় ব'সে আছেন - তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের
দুর্বল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নড়ছে চুল।
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
মোল্লাবাড়ির এক বিধবা দাঁড়িয়ে আছে
নড়বড়ে খুঁটি ধ'রে দগ্ধ ঘরের।

স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে
বসে আছে পথের ধারে।
তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,
কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী ব'লে নৌকা চালায় উদ্দান ঝড়ে
রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস
এখন পোকার দখলে
আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুড়ে বেড়ানো
সেই তেজী তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হ'তে চলেছে --
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত
ঘোষণার ধ্বনিপ্রতিধ্বনি তুলে,
মতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক
এই বাংলায়
তোমাকেই আসতে হবে, হে স্বাধীনতা।

কবি শামসুর রাহমানের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী

আজ আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান পুরুষ কবি শামসুর রাহমানের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী। পুরনো ঢাকার মাহুতটুলি এলাকার ৪৬ নম্বর বাড়িতে কবি জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৯ সালের ২৪ অক্টোবর তারিখে। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি অবশ্য ছিল নরসিংদীর রায়পুরা থানার পাড়াতলি গ্রামে। 'সাপ্তাহিক সোনার বাংলা' নামক পত্রিকায় ১৯৪৮ সালে ঊনিশশো ঊনপঞ্চাশ নামক কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে শামসুর রাহমানের কবিতা লেখার যাত্রা শুরু হয়। তাঁর লেখায় দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, মানবীয় অনুভূতিই ছিল প্রধান বিষয়।

১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজ পত্রিকায় সাংবাদিকতার মাধ্যমে শামসুর রাহমান কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে রেডিও পাকিস্তান, দৈনিক পাকিস্তানদৈনিক বাংলা প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি কাজ করেছেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন।

শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। তিনি মোট ৬৬টি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রৌদ্র করোটি, বিধ্বস্ত নীলিমা, নিরালোকে দিব্যরথ, নিজ বাসভূমে, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়, ইকারুসের আকাশ, উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ, অন্ধকার থেকে আলোয় প্রভৃতি। শামসুর রাহমা উপন্যাস লিখেছেন ৪টি, প্রবন্ধগ্রন্থ লিখেছেন ১টি, ছড়ার বই ৮টি এবং অনুবাদ ৬টি।

সমকালীন বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান মারা যান ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট তারিখে। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত কবিতা "স্বাধীনতা তুমি" যতদিন বাঙালি থাকবে, ততদিন দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের মনে চেতনার ঝংকার তুলবে।

স্বাধীনতা তুমি

স্বাধীনতা তুমি
রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুল, ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো
মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা
স্বাধীনতা তুমি
শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা
স্বাধীনতা তুমি
পতাকাশোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।
স্বাধীনতা তুমি
ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।
স্বাধীনতা তুমি
রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার।
স্বাধীনতা তুমি
মজুর যুবার রোদে ঝলসিত বাহুর গ্রন্থিল পেশী।
স্বাধীনতা তুমি
অন্ধকারে খাঁ খাঁ সীমান্তে মুক্তিসেনার চোখের ঝিলিক।
স্বাধীনতা তুমি
বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর
শাণিত কথার ঝলসানিলাগা সতেজ ভাষণ।
স্বাধীনতা তুমি
চাখানায় আর মাঠে ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ।
স্বাধীনতা তুমি
কাল বোশেখীর দিগন্তজোড়া মত্ত ঝাপটা।
স্বাধীনতা তুমি
শ্রাবণে অকূল মেঘনার বুক
স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন।
স্বাধীনতা তুমি
উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।
স্বাধীনতা তুমি
বোনের হাতে নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ।
স্বাধীনতা তুমি
বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার।
স্বাধীনতা তুমি
গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,
হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।
স্বাধীনতা তুমি
খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা,
খুকীর অমন তুলতুলে গালে
রৌদ্রে খেলা।
স্বাধীনতা তুমি
বাগানের ঘর, কোকিলের গান,
বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,
যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিবস

আজ ২২শে শ্রাবণ। বাংলার কবি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুদিবস। আজকে তাঁর "পঁচিশে বৈশাখ" কবিতাটির কিছু অংশ উল্লেখ করছি।

পঁচিশে বৈশাখ

পঁচিশে বৈশাখ চলেছে
জন্মদিনের ধারাকে বহন ক'রে
মৃত্যুদিনের দিকে।
সেই চলতি আসনের উপর ব'সে কোন কারিগর গাঁথছে
ছোট ছোট জন্মমৃত্যুর সীমানায়
নানা রবীন্দ্রনাথের একখান মালা।।

রথে চড়ে চলেছে কাল;
পদাতিক পথিক চলতে চলতে পাত্র তুলে ধরে,
পায় কিছু পানীয়;
পান সারা হলে পিছিয়ে পড়ে অন্ধকারে;
চাকার তলায় ভাঙা পাত্র ধুলার যায় গুঁড়িয়ে।
তার পিছনে পিছনে
নতুন পাত্র নিয়ে যে আসে ছুটে,
পায় নতুন রস,
একই তার নাম,
কিন্তু সে বুঝি আর-একজন।।

বই আলোচনা সমালোচনা

সাহিত্যের Webzine