বৃষ্টি'র সমার্থশব্দ

আজ যদিও তীব্র তাপদাহ ছিল তারপরও ঋতুবিচারে চলছে বর্ষাকাল। আর এই বর্ষাকালে বৃষ্টি শব্দটির কিছু সমার্থশব্দ প্রকাশ করার ইচ্ছা বোধ করছি। প্রধান শব্দ বৃষ্টি'কে (ভুক্তি নং: ৩৮৮) ঘিরে যেসব ভাবাত্মক শব্দ মনে আসে তার তালিকা নেয়া হয়েছে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এর যথাশব্দ গ্রন্থ থেকে। পৃষ্ঠা - ১২২, ১৯৯৩।

তালিকাটি নিম্নরূপ-
বি. বৃষ্টি বিষ্টি বর্ষণ বারি। মেঘ, ঘন, -রস। মেঘোদক মেঘদ্রব দিব্যোদক আকাশসলিল। জল নীরদবাহন গোধৃত পরামৃত খবারি গগনাম্বু। বৃষ্টি, -বিন্দু, -ফোঁটা। বারিবিন্দু। বৃষ্টিজল আতপবর্ষ্য। বরিষণ। বৃষ্টি,-পাত,-সম্পাত। ধারা,-পাত,সম্পাত,-পতন,-বর্ষণ,-বর্ষ,-জল। আসার ধারাসার ডাওর। বারি,-পাত,-বর্ষণ। বৃষ্টি, বারি,বর্ষা, বাদল, বরিষণ,-ধারা। বাদল,-বর্ষণ,-বরিষণ। মেঘাম্বুপাত। মুষল, অঝোর, উতল,-ধারা। ঘোরবর্ষণ অবিরলপাত। ঝেঁপে বৃষ্টি। গুঁড়িগুঁড়ি, টিপটিপি,ঝিরঝিরে,-বৃষ্টি। ইলশেগুঁড়ি। শিলাবৃষ্টি। সুবৃষ্টি।অতিবৃষ্টি।পশলা। একবারের বর্ষণ। বর্ষা বাদল বাদলা। বৃষ্টি, বর্ষা,-বাদল। ভরা,-বাদল,-ভাদর। ঝড়,-বৃষ্টি,-বাদল। বর্ষাকাল প্রাবৃট প্রাবৃষ প্রাবৃষা। আষাঢ় শ্রাবণ। বাদল,-বাতাস,-বায়ু,-হাওয়া। জোলো হাওয়া। বাদল, বাদলা,-দিন। বৃষ্টিবাদলার দিন। বাদল,-রাত,-নিশীথ বাদলারাত। ঝড়ের রাত। দুর্যোগের রাত। বাদল,-সাঁঝ,-সন্ধ্যা। দুর্যোগ। খারাপ আবহাওয়া। শিশির শিশিরকণা নীহারবিন্দু হিমজল পালা খজল শবনম মিহিকা হিমিকা খবাষ্প শীকর হিম। রাত্রি, রজনী,-জল। বৃষ্টিমানযন্ত্র বৃষ্টিমাপক রেইনগেজ। বারিমণ্ডল। মেঘ। বর্ষাতি রেইনকোট ওয়াটারপ্রুফ।

ক্রি. বৃষ্টি পড়া বা ঝরা। বৃষ্টি নামা। বৃষ্টি আসা। জল হওয়া। আকাশ ভাঙা। বৃষ্টি থামা বা ধরা। হিম পড়া।

বিণ. বৃষ্ট বর্ষিত কৃতবর্ষণ। সিক্ত আর্দ্রীকৃত। বৃষ্টি,-ভেজা,-সিক্ত, -স্নাত,-ধোওয়া। জল, বর্ষা,-ভেজা। বৃষ্টি,-স্নিগ্ধ,-সজল। বর্ষণ,-সিক্ত,-স্নাত। বর্ষণ, বর্ষা,-ধৌত। বৃষ্টি, বর্ষণ,-মুখর। বৃষ্টি, বর্ষা, বর্ষণ, বরিষণ,-মুখরিত। বর্ষণমন্দ্রিত। বর্ষণশীল। বাদলা বাদুলে। দুর্যোগপূর্ণ। ঝিরঝিরে টিপটিপে গুঁড়িগুঁড়ি ঝমঝমে। সজল। জল, বর্ষণ,-গর্ভ। বর্ষণোন্মুখ। শৈশির।

ক্রি-বিণ. মুষলধারে ঝমঝমিয়ে। রিমঝিমিয়ে। ধারাকারে।

ডাকের বচন

খনার বচন আমরা জানি। কিন্তু ডাকের বচনকে অতটা চিনিনা। অথচ ডাকের বচন এককালে বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল। কৃষক ও বউঝিরা এই বচনগুলোকে কণ্ঠস্থ করে রাখতেন। তবে খনার বচন বেশি প্রচলিত বলে তার ভাষা কালক্রমে সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু ডাকের বচন অতটা প্রখ্যাত হয় নি বলে তার ভাষার প্রাচীনতা অনেকাংশেই রক্ষা পেয়েছে। 'ডাক' কোন ব্যক্তিবিশেষের নাম নাও হতে পারে। হয়ত একাধিক ব্যক্তি কালক্রমে বিশেষ জ্ঞানের যে পদগুলো রচনা করেছেন তাকেই ডাকের বচন বলা হয়। ডাক শব্দটি ডাকিনী শব্দের পুংলিঙ্গ হতে পারে। মধ্যযুগে বা প্রাচীন যুগে জ্ঞানী ব্যক্তিরা আধিভৌতিক শক্তির অধিকারী ছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। "চলিত কথা' অর্থেও ডাকের বচন কথাটি প্রযুক্ত হতে পারে। দীনেশচন্দ্র সেন অবশ্য ডাক'কে বঙ্গের সক্রেতীস্‌ বলেছেন। (বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, ১ম খণ্ড, ১৯৯৬, পৃ. ৯৪)

খনা কৃষক ও গ্রহনক্ষত্র বিষয়ে পণ্ডিত ছিলেন। তার বচনগুলির বেশিরভাগ কৃষিকাজ ও ভাগ্যগণনা সম্পর্কিত। কিন্তু ডাকের বচন কিছুটা ভিন্নরকম। এখানে মানব-চরিত্রের বিভিন্ন দিককে কখনও নির্মোহ কখনও বা সরাসরি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মানবজীবনের সারাৎসার ডাকের বচনগুলির অন্যতম আলোচ্য বিষয়। ধারণা করা হয় এই ডাকের বচনগুলি ৮০০-১২০০ খৃস্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়েছিল।

ডাকের বচনের কয়েকটি উদাহরণ:-
ক) ঘরে আখা বাইরে রাঁধে।
অল্প কেশ ফুলাইয়া বাঁধে।।
ঘন ঘন চায় উলটি ঘাড়।
ডাক বলে এ নারী ঘর উজার।।

খ) নিয়ড় পোখরি দূরে যায়।
পথিক দেখিয়ে আউড়ে চায়।।
পর সম্ভাষে বাটে থিকে।
ডাক বলে এ নারী ঘরে না টিকে।।

গ) রাঁধে বাড়ে গায় না লাগে কাতি।
অতিথি দেখিয়া মরে লাজে।
তবু তার পূজার সাজে।।
সুশীলা শুদ্ধ বংশে উৎপত্তি।
মিঠা বোল স্বামীতে ভকতি।।
রৌদ্রে কাঁটা কুঁটায় রাঁধে।
খড়কাট বর্ষাকে বাঁধে।।
কাখে কলসী পানীকে যায়।
হেটমুণ্ডে কাকহো না চায়।।
যেন যায় তেন আইসে
বলে ডাক গৃহিণী সেই সে।।

প্রথম দিনের সূর্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ থেকে এই কবিতাটি উদ্ধৃত করার লোভ সামলানো গেল না।

প্রথম দিনের সূর্য -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্ত্বার নতুন আবির্ভাবে
কে তুমি?
মেলেনি উত্তর।
বৎসর বৎসর চলে গেল।
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল
পশ্চিম সাগর তীরে
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়-
কে তুমি?
পেলনা উত্তর।
জোঁড়াসাকো। কলিকাতা সকাল। ২৭ জুলাই ১৯৪১। [১১ শ্রাবণ '৪৮]

বাংলা সাহিত্যের প্রথম গদ্য

জানা মতে বাংলা সাহিত্যের প্রথম গদ্য রচনা করেন "দোম আন্তোনিও"। ইনি বাঙালি। পূর্ববঙ্গের ভূষনার জমিদারের পুত্র। শৈশবে অপহৃত হয়েছিলেন পর্তুগীজ দাসব্যবসায়ীদের দ্বারা। পরে মিশনারীরা তাকে উদ্ধার করে। তাকে খ্রিস্টিয় ধর্মে দীক্ষিত করে। রোমান হরফে লিখিত এই বইটি কখনও প্রকাশিত হয়েছিল কি না তা সম্পর্কে নিশ্চিত কোন তথ্য পাওয়া যায় না। মতান্তরে এই বইটি ১৭৪৩ সালে লিসবন এ মুদ্রিত হয়েছিল। তার লেখা বইটি খ্রিস্ট ধর্মের প্রচারণার উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল। হিন্দুধর্মের অবতারবাদকে হেয় প্রতিপন্ন করাই ছিল লেখকের উদ্দেশ্য। তাই ব্রাহ্মণ এর সাথে পাদরির বিতর্কে পাদরিকেই বিজয়ী হিসেবে প্রতিপাদন করা হয়েছে।
মূল বইটি পর্তুগালের এভোরা শহরে আছে। ঐতিহাসিক পণ্ডিত সুরেন্দ্রনাথ সেন এটা আবিষ্কার করেন। রোমান লিপিতে লেখা মূল রচনা বাংলা লিপিতে রূপান্তর করে প্রকাশ করেন। গ্রন্থটির নাম দেয়া হয় "ব্রাহ্মণ-রোমান ক্যাথলিক সংবাদ" তবে পর্তুগীজ নামের সম্পূর্ণ অনুবাদ করলে সম্পূর্ণ নাম হবে - "জনৈক খ্রীস্টান অথবা রোমান ক্যাথলিক ও জনৈক ব্রাহ্মণ বা হিন্দুদিগের আচার্যের মধ্যে শাস্ত্রসম্পর্কীয় তর্ক ও বিচার"

বাংলা গদ্যে রচনা তখনও শুরু হয় নি। ফলে তিনি কোন আদর্শ রচনাকে সামনে পাননি। পর্তুগীজ ভাষায় প্রচলিত গদ্যকে অবলম্বন করে তিনি বইটি লিখেছেন।

কথোপকথনের ভঙ্গিতে রচিত বইটিতে ব্রাহ্মণ কোন প্রসঙ্গ টানলে পাদরি তার দোষ ধরেন। এই ছিল বইটির মূল রচনাভঙ্গি।
ব্রাহ্মণ: ভালো এহা তো উসেদ করিলা, আর অবতার কহি তাহার বিচার কহ।
পাদরি: এহা নি তোমি মিথা হেন জানিলা? তবে আর অবতার কহিলে বুঝিবা সেই রূপ মিথা, ভালো আর অবতার কত।
ব্রাহ্মণ: আর অবতার ত্রেতা যুগে শ্রী রামো দশরথের বেটা, কোশল্যা তাহান মাতা।
পাদরি: এ অবতার যে কহিলা শ্রী রামো কি কারন অবতার হই আসিলেন?
ব্রাহ্মণ: রাবণ বধের কারণ: শে শকল দেবতারে কষ্ট দিত ধর্ম নষ্ট করিত।
পাদরি: ভালো সকল চরিত্র কহিবা রামের; তবে বুঝাইব কেমতে পরমো ব্রহ্ম তিনি।
দোম আন্তোনিও হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও হিন্দুধর্ম সম্পর্কে ভাল জানতেন না। এর পরিচয় তার লিখিত বইতেই রয়েছে। হিন্দু ধর্মকে হাস্যকর প্রতিপন্ন করতে গিয়ে তিনি অনেক জায়গায় নিজেকেই হাস্যাস্পদ করে তুলেছেন। আপত্তিকর ভাষায় হিন্দু ধর্মকে আক্রমণ করে নিজ ধর্মের মহিমা প্রকাশে তিনি মোটেও কার্পণ্য করেননি। তার গদ্যের আরেকটি উদাহরণ:-
বলি বড়ো ধর্মষ্ঠ ছিলো যে যাহারে চাহিত, তাহারে তাহা দিতো এ কারণে পরমেশ্বর ব্রাহ্মণ রূপে হইয়া একপদ দিয়া পৃথিবীতে, একপদ পাতালে, আর পদ স্বর্গে, এইরূপে বলিরাজারে ছলিলেন।
তথ্যের আকর হিসেবে দোম আন্তোনিওর গ্রন্থের মূল্য যাই হোক না কেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম গদ্যগ্রন্থ হিসেবে এর নাম বাংলা ভাষার আয়ুসমান স্থায়ী থাকবে।

বই আলোচনা সমালোচনা

সাহিত্যের Webzine