একুশের কবিতা- সৈয়দ শামসুল হক

একুশে ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে রচিত কবিতার সংখ্যা খুব বেশি নয়। এদের মধ্যেও ব্যাপকভাবে পঠিত হয়েছে এমন কবিতার সংখ্যা অনেক কম। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের এই কবিতাটি সেই স্বল্প সংখ্যক কবিতাগুলোর মধ্যে একটি:-

একুশের কবিতা
সৈয়দ শামসুল হক

সভ্যতার মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি
শিশুর জন্ম থেকে জরাদেহ ক্ষীণশ্বাস মানবের অবলুপ্তির সীমারেখায়
বলে গেল সেই কথা। সেই কথা বলে গেল অনর্গল--

তপ্তশ্বাস হাহুতাশ পাতাঝরা বিদীর্ণ বৈশাখীর জ্বালাকর দিগন্তে
আষাঢ়ের পুঞ্জীভূত কালো মেঘ আসবেই ঠিক।
সাগরের লোনাজলে স্নিগ্ধ মাটীর দ্বীপ
শ্যামলী স্বপ্নের গান বুকে পুষে
নবীন সূর্য্যেরে তার দৃঢ় অঙ্গীকার জানাবেই।
সংখ্যাহীন প্রতিবাদ ঢেউয়েরা আসুক, তুমি স্থির থেকো।
প্রাকৃতিক ঝঞ্ঝাবাত অবহেলা করি
সঞ্চয় করে যাও মুঠো মুঠো গৈরিক মাটী:
সবুজ গন্ধবাহী সোনালী সূর্য্যের দিশা
অকস্মাৎ উদ্ভাসিত কোরে দেবে তোমার চলার পথ।

সভ্যতার মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি
শিশুর জন্ম থেকে জরাদেহ ক্ষীণশ্বাস মানবের অবলুপ্তির সীমারেখায়
বলে গেল সেই কথা। সেই কথা বলে গেল অনর্গল--
পৃথিবীর জিজীবিষু আত্মার আছে। ঘনীভূত জনতার হৃদয়ে হৃদয়ে
উজ্জ্বল শিখা সেই অমর সংবাদে ঢেউ তুলে দিয়ে গেল।।

সূত্র: একুশে ফেব্রুয়ারি, সম্পাদনা: হাসান হাফিজুর রহমান। ২০০১, সময়, পৃ- ৪৭।
(বানানরীতি অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে।)

জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুদিবস

আজ ঝরা পালকের কবি জীবনানন্দ দাশ এর মৃত্যুদিবস। জন্মেছিলেন বরিশালে, ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ সালে। বরিলাশের কেটেছে শৈশব ও কৈশোর। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক (সম্মান) ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম এ ডিগ্রি লাভ করেন। অধ্যাপনা ছিল সবচেয়ে পছন্দের কাজ। কিছুদিন ইনসিওরেন্স কোম্পানির এজেন্ট ছিলেন, ব্যবসাও করেছেন। কিন্তু শেষে স্থিত হয়ে চেয়েছেন আই এ পড়েছেন যে কলেজে সেই ব্রজমোহন কলেজের অধ্যাপক পদে। কিন্তু তাও পারেননি। ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত ছিলেন এখানে। তারপর কলকাতায় চলে যান। ১৯৪৭ সাল থেকে 'দৈনিক স্বরাজ' পত্রিকার সাহিত্য বিভাগ দেখতেন। এরপর খড়গপুর কলেজ, বড়িষা কলেজ ও হাওড়া গার্লস কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত হাওড়া গার্লস কলেজে ছিলেন।

সাহিত্য রচনার প্রাথমিক অবস্থায় তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যেন্দ্রনাথ প্রমুখের দ্বারা প্রভাবিত হলেও শেষ পর্যন্ত একটি নিজস্ব ধারার সূচনা করেন। তিনি বাংলা কাব্যে এক সম্পূর্ণ মৌলিক রচনারীতির প্রকাশ ঘটান। বাংলার প্রকৃতি তার কাব্য এক অন্যরকম ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠে। আধুনিক নাগরিক জীবনের দুঃখ, হতাশা, নৈঃশব্দ, নিঃসঙ্গতা তার কাব্যে প্রকৃতির উপমায় চিত্রময়তা লাভ করে।

'ঝরা পালক', 'ধূসর পাণ্ডুলিপি', 'রূপসী বাংলা', 'বনলতা সেন', 'মহাপৃথিবী', 'সাতটি তারার তিমির' তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তিনি একটিমাত্র প্রবন্ধগ্রন্থ লিখেছেন, 'কবিতার কথা'। মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় তার উপন্যাস 'মাল্যবান' ও 'সতীর্থ' এবং গল্পগ্রন্থ 'জীবনানন্দ দাশের গল্প'। ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতার রাস্তায় এক ট্রামের নিচে চাপা পড়ে বেদনার কবি জীবনানন্দের করুণ মৃত্যু হয়।

বর-কনের জন্য শুভমন্ত্র

শুভবিবাহের তুঙ্গমুহূর্তে যখন বর-কনে শুভদৃষ্টি বিনিময় করে, ঠিক সেইমুহূর্তে খারাপ মানুষেরা কুদৃষ্টি দিতে পারে। অমঙ্গলকামীদের ভাবনার ছোঁয়া বর-কনের জীবনে যেন না লাগে, সেজন্য এই মন্ত্রটি পড়া হয়। মানস মজুমদার তাঁর লোক-ঐতিহ্যের দর্পণে বইতে এই মন্ত্রটির কথা উল্লেখ করেছেন।
খুঁটিনাটি ছেড়ে দাও,
ভালমন্দ লোক থাক তো সরে যাও।
নইলে আমার মতো হাত হবে,
এক পালি চেলের ভাত ছ মাস খাবে।
প্রজাপতি নির্বন্ধ,
ভাল ছেড়ে যিনি করেন মন্দ,
শ্রীগৌরাঙ্গ হবে তার বাম।
তার মাছের হাঁড়ি ষাড়ে খাবে,
বেড়ালে চাল ফেরে যাবে।
গ্রীষ্মকালে টেরটা পাবে।
যেমনি কন্যা তেমনি বর,
পার্বতী আর দিগম্বর।
সখিগণে নগেন্দ্র ভুবনে,
দুর্গা দুর্গা বলে গো বদনে।।
মানস মজুমদার এই মন্ত্রটি হুগলী অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করেছেন।
বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা-ওয়াকিল আহমদ, ২০০৭, ৬২২

কিরা কাটানোর মন্ত্র

প্রদেয় প্রতিজ্ঞাটি যেন খাটে, বাস্তবায়িত হয় তার জন্য কিরা কাটা হয়। 'অমুকের কিরা কাজটি আমি করে দেব'- বললে তার (কাজটি) প্রতি দায়বদ্ধতা এসে যায়। অনেক সময় অন্যের ক্ষতি করার জন্য, অমঙ্গল কামনার জন্যও কিরা কাটা হয়। 'অমুকের কিরা তোর সন্তান মরবে'- এভাবে বলে শক্রুর বিপদ কামনা করা হয়। বিপক্ষ যদি ভয় না পায়, বক্তার বাধ্য না হয়, সমান শক্তিধর হয়, তাহলে কথাটাকে তাচ্ছিল্য করতে পারেন। 'শকুনের দোয়ায় গরু মরেনা' বলে অমঙ্গল আশঙ্কাকে দূর করা যায়। কিন্তু তারপরও যদি বাস্তবায়িত হয়। তখন নোংরা শব্দের শক্তিকে ভেঙ্গে ফেলবার প্রয়োজন হয়। সেজন্য দরকার পরে আর এক রকমের কিরা'র। উল্টো কিরা কেটে প্রতিপক্ষের কিরাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা যায়। এর নাম কিরা কাটানোর মন্ত্র। রাজশাহী অঞ্চলে ব্যবহৃত হয় এরকমের একটি কিরা কাটান দেওয়ার মন্ত্র:
এপারে কলাগাছ, ওপারে কলাগাছ,
তোর কিরা কাটল ঘসাঘস।
কড়া পাইলের হাইস্যা,
গেল তোর কিরা ফাস্যা।
ঠিলির উপর ঠিলি,
তোর কির‌্যা গিলি।।
এই মন্ত্রটিও আশরাফ সিদ্দিকী রচিত লোকসাহিত্য গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে।

কিরা কাটার মন্ত্র

"কিরা কাটা" শব্দটির অর্থ সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধানে লেখা রয়েছে এভাবে:
কিরা, কিরে বি শপথ, দিব্যি। [স. ক্রিয়া> কিরিয়া>কিরা] কিরা কাটা, কীরা কাটা ক্রি শপথ করা।
অর্থাৎ কিরা শব্দটি একটি বিশেষ্য। মূল সংস্কৃত শব্দ ক্রিয়া থেকে শব্দটির উৎপত্তি। শপথ করা, প্রতিজ্ঞা করা, কোন প্রদেয় কথাকে পালন করা এরকম কিছুকে বোঝায়।

কিরা কাটতে হলে মন্ত্র লাগে। তাহলে এর শক্তি বাড়ে। পোক্ত হয়। যা নিয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া তা পালনে দৃঢ়সংকল্প হওয়া যায়।
লোকজ জীবনে আমরা প্রায়ই কিরা কেটে থাকি। "'কোন কিছু করা' অথবা 'কোন কিছু করা থেকে বিরত থাকা'র জন্য দিব্য দেই।
আশরাফ সিদ্দিকীর লোকসাহিত্য বই হতে নিচের কিরাটি সংগ্রহ করা হয়েছে। এটা কিরা কাটার মন্ত্র।
তোর উপর চড়া,
কিরা থাকল কড়া।
ঢেঁকির উপর রক্ত,
আমার কিরা শক্ত।
কাঁচা কঞ্চি পাকা বাঁশ,
কিরা থাকল বার মাস।।
রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ এই কিরাটি ব্যবহার করে।

কাজী নজরুলের গানে ঈশ্বর

কাজী নজরুলের গানে ঈশ্বর বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছেন। কখনও রুদ্র মূর্তি কখনও বা শিশুমূর্তি। তাঁর একটি বিখ্যাত গান রয়েছে যেখানে ঈশ্বর শিশুরূপ গ্রহণ করে পৃথিবীকে নিয়ে নিরন্তর খেলা করে চলছেন।
খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে
প্রলয়-সৃষ্টি তব পুতুল খেলা নিরজনে,
প্রভু, নিরজনে।
শূন্যে মহা-আকাশে
মগ্ন লীলা-বিলাসে
ভাঙিছ গড়িছ নিতি ক্ষণে ক্ষণে-
তারকা-রবি-শশী খেলনা তব
হে উদাসী
পড়িয়া আছে তব পায়ের কাছে
রাশি রাশি।

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা

গতকাল শামসুর রাহমানের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হল। স্বাধীনতার জন্য তাঁর যে আকুলতা তা স্পষ্ট হয়েছে আর একটি কবিতায়। এই কবিতার নাম তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?

তুমি আসবে ব'লে, হে স্বাধীনতা,
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,
সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর।
তুমি আসবে ব'লে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মত চিত্কার করতে করতে
তুমি আসবে ব'লে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হলো। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।
তুমি আসবে ব'লে, ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।
তুমি আসবে ব'লে, বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভূর বাস্তুভিটার
ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করলো একটা কুকুর।
তুমি আসবে ব'লে, হে স্বাধীনতা,
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিলো পিতামাতার লাশের উপর।

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে এক থুত্থুরে বুড়ো
উদাস দাওয়ায় ব'সে আছেন - তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের
দুর্বল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নড়ছে চুল।
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
মোল্লাবাড়ির এক বিধবা দাঁড়িয়ে আছে
নড়বড়ে খুঁটি ধ'রে দগ্ধ ঘরের।

স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে
বসে আছে পথের ধারে।
তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,
কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী ব'লে নৌকা চালায় উদ্দান ঝড়ে
রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস
এখন পোকার দখলে
আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুড়ে বেড়ানো
সেই তেজী তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হ'তে চলেছে --
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত
ঘোষণার ধ্বনিপ্রতিধ্বনি তুলে,
মতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক
এই বাংলায়
তোমাকেই আসতে হবে, হে স্বাধীনতা।